কালচারাল ইয়ার্ড ডেস্ক:
সিলেটের নিস্তব্ধ ভোরে জন্মেছিলেন তিনি। ১৯৫২ সালের ১৭ নভেম্বর পৃথিবীতে আগমন সেই শিশুটির, যাকে ভবিষ্যৎ অচিরেই ডেকে নেবে দক্ষিণ এশিয়ার সঙ্গীত-আকাশে। তার নাম—রুনা লায়লা। শুরুটা ছিল পর্দার আড়ালে, নিভৃতে—কিন্তু খুব বেশিদিন নয়। করাচির বয়স-ছয় বছরের মঞ্চে প্রথম গান গাওয়ার মধ্যেই বোঝা গিয়েছিল, এই কণ্ঠ কোনো সাধারণ প্রতিশ্রুতি নয়; এর মধ্যে ছিল ভবিষ্যতের এক দীর্ঘ প্রতিধ্বনি।
রুনার গানজীবনের প্রথম আলো জ্বলে যায় হঠাৎই—বোন দিনা লায়লার অসুস্থতার কারণে। তানপুরা হাতে নিয়ে যে মেয়ে প্রথমে শুধু অভিনয় করছিল, সেখান থেকে গানের দিকেই তার পরবর্তী যাত্রা সিল হয়ে যায়। সেই শিশুগায়ক পরবর্তীকালে চলচ্চিত্রের পর্দায় প্রথম কণ্ঠ দেন ‘জুগনু’ ছবিতে—মাত্র বারো বছরে। দিন-রাত অনুশীলন, স্কুলের আগে দুই ঘণ্টা, পরেও দুই ঘণ্টা—ছোট্ট রুনার শৃঙ্খলা যেন বড়দেরও লজ্জায় ফেলবার মতো।
তারপর সেই চিরচেনা ধারা—বাংলা, হিন্দি, উর্দু; একের পর এক চলচ্চিত্র, মঞ্চ, অ্যালবাম। ১৮টি ভাষায় গান। ক্লাসিক্যাল থেকে পপ, গজল থেকে আধুনিক—সবখানে সমান সাবলীল। শুধু সুর নয়, ভাষাও যেন তার কাছে ছিল সহজাত দক্ষতা।
তবু গল্পে সবচেয়ে আকর্ষণীয় বাঁক হয়তো ছিল ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন। পাকিস্তানজুড়ে জনপ্রিয় এক তারকা, দেশের মাটিতে ফিরে পেলেন নতুন পরিচয়সূত্র। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস, নতুন বন্ধু, আর এক অদ্ভুত স্বস্তির শ্বাস—নিজের দেশকে আবার নিজের মতো করে পাওয়া।
এই সময়েই ভারতীয় দর্শকরা আবার আবিষ্কার করল রুনাকে। বিজ্ঞান ভবন থেকে শানমুখানন্দ হল—যেখানেই মঞ্চে ওঠেন, ভিড় যেন অপেক্ষা করে শুধু একটাই মুহূর্তের জন্য: “দামাদাম মস্ত কalandar”।
নাম হয়ে গেল—‘দামাদাম গার্ল’।
ক্যারিয়ারের আরেক শিখর আসে লন্ডনের কিংবদন্তি এবি রোড স্টুডিওতে। বাপ্পী লাহিড়ীর সুরে রেকর্ড করা অ্যালবাম ‘সুপার রুনা’ প্রকাশের প্রথম দিনেই বিক্রি হলো এক লাখ কপি। এমন সাফল্য দক্ষিণ এশিয়ার নারী শিল্পীদের জন্য তখন দুষ্প্রাপ্য ছিল।
চলচ্চিত্রে অভিনয়ের গল্পটাও কম নাটকীয় নয়। বহু প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়ার পর অবশেষে ‘শিল্পী’ সিনেমায় নিজেরই জীবনের কিছু অনুরণন নিয়ে পর্দায় আসেন তিনি। চাষী নজরুল ইসলামের পরিচালনায় আলমগীরের বিপরীতে। অভিজ্ঞতার কাছে নতুনত্বের উত্তাপ ছুঁয়ে থাকে—এই ছবি আজো অনেকের কাছে বিশেষ।
ক্যারিয়ারের সবচেয়ে আলোচিত সাফল্যের একটি—নিসার বাজমির সঙ্গে এক সেশনে তিন দিনে ৩০টি গান রেকর্ড—যা পরে গিনেস বুকে স্থান পায়। এটি শুধু রেকর্ড নয়; এটি শিল্পীর শ্রম, শৃঙ্খলা এবং কণ্ঠের সহনশীলতার এক অসামান্য সাক্ষ্য।
ষাট বছরেরও বেশি সময় ধরে গান করছেন তিনি। অথচ কণ্ঠের মেদহীন দীপ্তি আজও বদলায়নি। কোক স্টুডিও বাংলায় প্রকাশিত সাম্প্রতিক গানগুলোর পর নতুন শ্রোতারাও আবার তাকে শুনছে, দেখছে, অবাক হচ্ছে—৭৩ বছর বয়সেও কীভাবে এত নির্মল গলা ধরে রাখা যায়?
রুনা লায়লা আসলে সময়-নির্ভর শিল্পী নন; তিনি নিজেই সময়কে অতিক্রম করে এগোনোর এক রূপক। বাংলাদেশের সঙ্গীত-ইতিহাসে তার নাম শুধু এক অধ্যায় নয়—এক পুরো যুগ।
এক কণ্ঠ—যা জন্ম থেকেই ভ্রমণ করছে দেশ-কাল-ভাষার সীমানা পেরিয়ে।
এক শিল্পী—যার গল্প শোনার পর মনে হয়, কিছু মানুষ জন্মায় আলো নিয়ে।