কালচারাল ইয়ার্ড ডেস্ক:
পাপেটের সুতো তাঁর হাতে যেনো প্রাণ পেত, রঙ-তুলির আঁচড়ে তিনি গড়েছেন একটি জাতির শৈশবের স্বপ্ন। মুস্তাফা মনোয়ার। তিনি নিবিষ্ট মনের একজন চিত্রকর, সংস্কৃতি অন্তপ্রাণ। ২৮ জুন সোমবার সকালে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে প্রয়াত হয়েছেন একুশে পদকপ্রাপ্ত বাংলাদেশ পুতুলনাচ বা পাপেটশিল্পের পুরোধা ও বরেণ্য চিত্রশিল্পী এই কিংবদন্তী। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯০ বছর।
বরেণ্য এই শিল্পীর প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) প্রাঙ্গণে। জানাজা শেষে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে তার মরদেহ নেওয়া হয়। সেখানে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে তাকে ‘গার্ড অব অনার’ দেওয়া হয়। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জানাজা শেষে বনানী কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
দীর্ঘদিন নিউমোনিয়া ও ক্যান্সারে ভুগছিলেন তিনি। তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নেমে আসে শোকের ছায়া। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শুরু হয় তাকে নিয়ে স্মৃতিচারণা।ফুসফুসের জটিলতা ও নিউমোনিয়াজনিত সংক্রমণ নিয়ে গত ১৪ জুন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন তিনি। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে স্থানান্তর করা হয় নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে। মাঝে কিছুটা উন্নতির আভাস মিললেও শেষরক্ষা হয়নি — প্রায় দুই সপ্তাহের চিকিৎসার পর থেমে গেল সেই হৃদয়, যা আজীবন রঙ আর গল্পের মধ্য দিয়ে কথা বলেছে।
জন্ম ও বেড়ে উঠা
১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর তৎকালীন যশোর জেলার মাগুরা মহকুমার নাকোল গ্রামে জন্ম নেওয়া এই শিল্পীর শিকড় ছিল ঝিনাইদহের শৈলকূপায়। কবি গোলাম মোস্তফার কনিষ্ঠ সন্তান মুস্তাফা মনোয়ার ছোটবেলায় গ্রামবাংলার পুতুলনাচ দেখে যে মুগ্ধতায় আচ্ছন্ন হয়েছিলেন, সেই মুগ্ধতাই তাঁকে পরিণত করেছিল বাংলাদেশের পাপেটশিল্পের পথিকৃতে। কলকাতা চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয় থেকে ফাইন আর্টসে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে দেশে ফিরে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের আহ্বানে আর্ট কলেজে শিক্ষকতা শুরু করেছিলেন তিনি। এরপর যোগ দেন পাকিস্তান টেলিভিশনে, যা পরে বাংলাদেশ টেলিভিশন নামে পরিচিতি পায়।
কর্ম ও সম্মান
টেলিভিশনের পর্দায় তাঁর হাতে গড়া পাপেট চরিত্রগুলো শুধু বিনোদন ছিল না, ছিল একটি প্রজন্মের শৈশবের অবিচ্ছেদ্য অংশ। মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে অসহযোগ আন্দোলনের সময় টেলিভিশনে প্রচারিত বিখ্যাত গণসংগীত পরিচালনায়ও ছিলেন তিনি। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পেছনের লাল সূর্যের প্রতিরূপ স্থাপনা থেকে শুরু করে দ্বিতীয় সাফ গেমসের মাসকট নির্মাণ — সৃজনশীলতার বহু ক্ষেত্রে তিনি রেখে গেছেন নিজের স্বাক্ষর। শিল্প ও সংস্কৃতিতে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৪ সালে তিনি পেয়েছিলেন দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদক।
মৃত্যুর খবর প্রথম নিশ্চিত করেন তাঁর ভাগ্নি, অভিনেত্রী নিমা রহমান। স্ত্রী মেরী মনোয়ার পরে জানান, ফুসফুসে মারাত্মক ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের সঙ্গে দীর্ঘদিন লড়েছেন তাঁর স্বামী; চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ চেষ্টার পরও শেষরক্ষা হয়নি। মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর বনানী কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হবে। এর আগে শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য মরদেহ নেওয়া হবে দীর্ঘদিনের কর্মস্থল বাংলাদেশ টেলিভিশন প্রাঙ্গণ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ এবং কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে, যেখানে সর্বস্তরের মানুষ শেষবারের মতো দেখতে পাবেন তাঁদের প্রিয় শিল্পীকে।
মুস্তাফা মনোয়ারের প্রয়াণে শোক জানিয়েছেন রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরাও। আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান তাঁকে স্মরণ করেছেন দেশের শিল্প-সংস্কৃতি জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে, যাঁর শূন্যতা সহজে পূরণ হওয়ার নয়।
একজন শিক্ষক হিসেবে যাঁর হাত ধরে তৈরি হয়েছেন বহু শিল্পী, একজন স্রষ্টা হিসেবে যিনি কাঠ-কাপড়ের পুতুলে দিয়েছেন প্রাণের ছোঁয়া — সেই মুস্তাফা মনোয়ার আজ নেই। কিন্তু তাঁর হাতে গড়া পাপেট, তাঁর আঁকা ছবি, আর শৈশবের পর্দায় ফেলে যাওয়া স্মৃতির রং রয়ে যাবে অনেকদিন। বিদায়, হে চিত্রকর।