কালচারাল ইয়ার্ড ডেস্ক:
কক্সবাজারের মঞ্চে অনেক দিন ধরেই নীরবতা ছিল। সেই নীরবতার ভেতরেই শনিবার সন্ধ্যায় এক শক্ত কণ্ঠে কথা বলল মাটি—তার নাম ‘ভূমিসূত্র’। বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী ও কক্সবাজার জেলা সংসদের প্রযোজনায় কক্সবাজার পাবলিক লাইব্রেরির শহিদ সুভাষ হলে মঞ্চস্থ হয় এই নাটক, যা শুধু একটি নাট্যপ্রদর্শনী নয়, বরং শহরের মঞ্চসংস্কৃতি পুনর্জাগরণের এক দৃঢ় ঘোষণা।
আইন, নিষেধাজ্ঞা আর ক্ষমতার অদৃশ্য দেয়ালে আটকে থাকা মানুষের জমি–সংগ্রামের গল্প নিয়ে এগোয় ‘ভূমিসূত্র’। কাব্যিক সংলাপ, সংগীত ও কোরাসের সমন্বয়ে নাটকটি দর্শককে নিয়ে যায় শোষণ, প্রতিরোধ এবং টিকে থাকার দীর্ঘ ইতিহাসের ভেতর।
নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র অরুপ কবিয়াল—একজন লোকগানশিল্পী, যার জীবিকা গান। কিন্তু তার জীবন ও আশপাশের মানুষ ক্রমে গ্রাস হয়ে যায় দীর্ঘদিনের দখলদারি ও ক্ষমতার চক্রে। সংবাদমাধ্যমে যখন উন্নয়নের গল্প ছড়ানো হয়, তখন বাস্তবতার কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠে আরও চাপা। এই দ্বন্দ্বকেই নাটকটি নির্মম বাস্তবতায় তুলে ধরে। এখানে জমি কেবল সম্পদ নয়—এটি ক্ষমতার উৎস, পরিচয়ের ভিত্তি এবং মানুষের শিকড়।
প্রায় অর্ধশতাধিক প্রশিক্ষণার্থীর অংশগ্রহণে নির্মিত নাটকটির রচনা ও নির্দেশনা দিয়েছেন ইমরান হোসেন ইমু। চার মাসব্যাপী প্রযোজনাভিত্তিক নাট্য কর্মশালার ফসল হিসেবে ‘ভূমিসূত্র’ যেন এক যৌথ কণ্ঠস্বর—যেখানে ব্যক্তিগত যন্ত্রণা মিলেমিশে যায় সামষ্টিক ইতিহাসে। সংগীত পরিচালনায় রিদিতা মায়িশা নাটকের আবহকে করেছে আরও গভীর ও অনুরণিত।
নির্দেশক ইমরান হোসেন ইমু বলেন, “‘ভূমিসূত্র’ শুধু জমির সংকটের গল্প নয়। এটি মানুষের শিকড়, অহংকার, লোভ ও স্বপ্নের টানাপোড়েনের প্রতিচ্ছবি। এই নাটকে মাটি নিজেই কথা বলে—তার বুকে জমে থাকে শোষণ, প্রতিরোধ ও অসহায়তার ইতিহাস।”
তিনি জানান, নাটকের কোরাসকে ‘মাটির আত্মা’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে—যারা ঘটনার নীরব সাক্ষী, ইতিহাসের ধারক এবং ভবিষ্যতের জন্য এক সতর্ক সংকেত।
বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, কক্সবাজার জেলা সংসদের সভাপতি আশুতোষ রুদ্রের ভাষায়, এই প্রযোজনা উদীচীর দীর্ঘমেয়াদি নাট্যচর্চার অংশ। তাঁর মতে, কর্মশালার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে মঞ্চের ভাষা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার সঙ্গে যুক্ত করাই ছিল এই উদ্যোগের লক্ষ্য।
নাটক শেষে দর্শকসারিতে অনুভূত হয়েছে দীর্ঘদিন পর পাওয়া এক ধরনের তৃপ্তি। দর্শক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “এ ধরনের নাটক শুধু বিনোদন দেয় না, আমাদের ভাবতে শেখায়। সমাজকে বুঝতে সাহায্য করে।” নাসরিন আক্তারের মতে, “নাটকটি দেখে মনে হয়েছে এটি আমাদেরই গল্প—জমি, মানুষ আর ক্ষমতার সম্পর্ক খুব কাছ থেকে তুলে ধরা হয়েছে।”
জেলার সাংস্কৃতিক সংগঠক আশরাফুল হুদা সিদ্দিকী জামশেদ বলেন, ‘ভূমিসূত্র’ কেবল উদীচীর একটি নাট্যপ্রযোজনা নয়; এটি কক্সবাজারের মঞ্চসংস্কৃতি ফিরে আসার একটি শক্ত বার্তা। মানুষের সঙ্গে মাটির সম্পর্ক, অধিকার ও বঞ্চনার গল্পকে কাব্যিক অথচ নির্মম বাস্তবতায় তুলে ধরেছে এই নাটক।
শেষ পর্যন্ত ‘ভূমিসূত্র’ মনে করিয়ে দেয়—মাটি কখনো নীরব থাকে না। কেউ না কেউ তার কথা শোনে, কেউ না কেউ তার গল্প বলে যায়। কক্সবাজারের মঞ্চে সেই গল্পই নতুন করে ধ্বনিত হলো।