মাত্র একত্রিশ বছর বয়সে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে পরপারে চলে গেলেন কনটেন্ট ক্রিয়েটর কারিনা কায়সার। চলে গেলেন আচমকা এবং নিঃশব্দে। তার মৃত্যুতে শোকে স্তব্ধ শোবিজ অঙ্গন। তিনি শুধু একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটরেই নন, তিনি জুলাই আন্দোলনে ছিলেন সামনের সারিতে। সারথি হিসেবে শোকাহত তার আন্দোলনের সাথীরাও। তার বাবা সাবেক তারকা ফুটবলার কায়সার হামিদ।
১৬ মে ভারতের চেন্নাইয়ের ভেলোর খ্রিষ্টান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের একটি কক্ষে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন এই সৃজনশীল কনটেন্ট ক্রিয়েটর। তার মৃত্যুর খবর দিয়েছেন তার বাবা বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক তারকা খেলোয়াড় কায়সার হামিদ। কায়সার হামিদ এক ফেসবুক স্ট্যটাসে লিখেছেন, ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। অত্যন্ত দুঃখের সাথে জানাচ্ছি যে, আমার প্রাণপ্রিয় আদরের মেয়ে কারিনা (kaarina kaisar) একটু আগে চেন্নাইতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আমাদের ছেড়ে ওপারে চলে গেছে। আমার মেয়ের কোনো ভুলত্রুটি হয়ে থাকলে কিংবা কাউকে কষ্ট দিয়ে থাকলে আপনারা তাকে ক্ষমা করে দেবেন। যারা এই দুঃসময়ে আমাদের পাশে ছিলেন, দোয়া করেছেন, সহযোগিতা করেছেন, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। দোয়া করবেন সবাই, আল্লাহ তাকে বেহেশত নসিব করুক। আমিন।
যেভাবে আক্রান্ত হলেন
সাধারণ একটি জ্বর, এরপর পরীক্ষা করলে ধরা পড়ে শরীরে সংক্রমণ। হেপাটাইটিস এ ও হেপাটাইটিস ই-তে আক্রমণ করে শরীর। দুটো মিলিয়ে এল মারাত্মক আঘাত হয়ে। কারিনার আগে থেকেই ফ্যাটি লিভারের সমস্যা ছিল। সেই দুর্বল লিভারে দ্বৈত সংক্রমণের চাপে ঘটল লিভার ফেইলিউর। তাঁকে ভর্তি করা হল ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে। অবস্থার দ্রুত অবনতি হলে আইসিইউ, তারপর লাইফ সাপোর্ট। চিকিৎসকরা চেষ্টা করলেন লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টের। কিন্তু তার আগে দরকার ছিল ফুসফুস স্থিতিশীল করা — কারণ সেখানেও জমে গিয়েছিল তরল আর কফ। চেন্নাই ভেলোরের সিএমসি হাসপাতাল, যেখানে আরও ভালো চিকিৎসার আশা ছিল। চিকিৎসকরা চেষ্টার ত্রুটি রাখেননি। কিন্তু সব চেষ্টা শেষ হয়ে গেল ১৫ মে রাতে — ফুসফুসে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়ার সময় হঠাৎ রক্তচাপ নেমে গেল অনেক নিচে। আর ফেরানো গেল না তাঁকে।
কারিনা কায়সার ‘এ’ লেভেল শেষ করে উচ্চশিক্ষার টানে পাড়ি দিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ায়। যাওয়ার আগে শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজ করেছিলেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে। এরপর কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন কারিনা কায়সার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর প্রাণবন্ত উপস্থাপনা আর জীবনঘনিষ্ঠ কনটেন্ট দর্শক মনে দ্রুতই জায়গা করে নেয়। তিনি একাধারে ছিলেন অভিনেত্রী, চিত্রনাট্যকার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর।
শোকে শোবিজ অঙ্গন
কারিনার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর দেশের শোবিজ অঙ্গন যেন হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে গেল। সহকর্মী অভিনয়শিল্পীরা, নির্মাতারা, সঙ্গে কাজ করা মানুষজন — সবাই সামাজিক মাধ্যমে ছুটে এলেন শোক জানাতে। ভক্তরা — যাঁরা কারিনার কনটেন্ট দেখে হাসতেন, তাঁর কাজ দেখে উৎসাহ পেতেন — তাঁরাও থাকলেন না পেছনে। তরুণ প্রজন্মের অনেকের কাছে কারিনা ছিলেন একজন ‘নিজের মানুষ’ — স্ক্রিনের ওপাশে থেকেও যিনি অনেক কাছের মনে হতেন। কারিনার সঙ্গে কাজ করা নির্মাতারা বললেন তাঁর নিষ্ঠার কথা, তাঁর পেশাদারিত্বের কথা। একজন অল্পবয়সী মানুষ যেভাবে চিত্রনাট্য লিখতেন, যেভাবে চরিত্রের গভীরে যেতেন — সেটা নাকি অনেককে অবাক করত। সবার কথায় উঠে আসছিল একটাই আক্ষেপ — এত তাড়াতাড়ি কেন?